বিশ্ব পরিবেশ সম্মেলনে ভাষণ রাখলেন শ্রী রাজনাথ সিং
নিজস্ব প্রতিনিধিঃ, 27/03/2017, নয়াদিল্লি

“এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দিতে পেরে আমি বিশেষভাবে আনন্দিত| এই সম্মেলনের আয়োজন করার জন্য আমি ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইবুনালকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করতে চাই| আমি নিশ্চিত যে এই সম্মেলন পরিবেশ নিয়ে জ্ঞান, ধারণা ও অভিজ্ঞতার আদান-প্রদানের উপযুক্ত মঞ্চ হিসেবে কাজ করবে | আজ আমি মহাত্মা গান্ধীর সেই অমূল্য বাণী মনে করিয়ে দিতে চাই, যেখানে তিনি বলেছেন, “সবার প্রয়োজনের তুলনায় পৃথিবীটা যথেষ্ট, কিন্তু সবার লোভের জন্য তা যথেষ্ট নয়” | মানব সমাজের ভালো থাকা, পরিবেশ এবং অর্থনীতির কার্যকারিতা শেষ পর্যন্ত এই গ্রহে পাওয়া প্রাকৃতিক সম্পদের বিবেচনাপূর্ণ ও দায়িত্বপূর্ণ পরিচালনার ওপর নির্ভর করে| আমাদের পৃথিবী-মাতা নিজে থেকে যা প্রদান করেন, মানব সমাজ তার চেয়ে খুব বেশি প্রাকৃতিক সম্পদ সংগ্রহ করা চালিয়ে যেতে পারে না|

মানব সমাজ আজ যে সংকটের মুখোমুখি, সেই সংকট আমাদেরকে মানুষ ও প্রকৃতির সম্পর্কের সম্পূর্ণ ক্ষেত্রকে, বিশেষ করে গত পাঁচ দশকের উন্নয়ন এবং তার ওপর ভিত্তি করে ভবিষ্যতের উন্নয়নের আলোকে পুনরায় পর্যালোচনা করায় বাধ্য করেছে | ভারতের মানুষ সর্বদাই প্রকৃতির সঙ্গে নাড়ির সম্পর্কে বিশ্বাস করে এবং আমরা তাঁকে প্রকৃতি-মা হিসেবে বিবেচনা করি| প্রকৃতি ছাড়া আমাদের অস্তিত্ব হয় না| মানব সভ্যতার ভালো থাকার জন্য প্রকৃতিকে শোষণ করা নয় বরং এর লালন ও পরিচর্যা করা প্রয়োজন| প্রকৃতি যখন সুস্থিতির মধ্যে থাকে, আমাদের জীবন ও যেখানে আমরা বসবাস করি সেই পৃথিবীর ভারসাম্য বজায় থাকে | আমাদের প্রাচীন গ্রন্থে প্রকৃতি ও মানুষের মধ্যে এক স্বাস্থ্যকর ও দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে| অথর্ব বেদ অনুযায়ী পৃথিবীকে রক্ষা করা আমাদের অবশ্য পালনীয় কর্তব্য, যাতে জীবন চলতে থাকে| প্রথিবীর সঙ্গে আমরা আমাদের সম্পর্ককে নির্ধারণ করি—‘মাতা ভূমি পুত্র অহম পৃথীব্য’|  পরিবেশকে সুরক্ষা দেওয়ার ধর্ম ছিল সবার অগ্রগতি ও কল্যাণ সুনিশ্চিত করার জন্য ও বজায় রাখার জন্য | এই প্রয়াসে প্রাচীন গ্রন্থগুলি পরিবেশকে শোষণ করার অধিকার ও একে সুরক্ষিত রাখার দায়িত্বের মধ্যে এক শক্তিশালী বিষয় হিসেবে কাজ করে| আর এই সুরক্ষা এখন ‘দীর্ঘস্থায়ী উন্নয়ন’-এর ধারণা হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত | ভারতের সংবিধানও স্পষ্টভাবে বলেছে যে, ‘পরিবেশের সুরক্ষা ও উন্নয়ন এবং দেশের বন ও বন্যপ্রাণীর সুরক্ষা দেওয়া’ রাষ্ট্রের দায়িত্ব|

জীবনের মৌলিক অধিকার ব্যাখ্যার সঙ্গে রাষ্ট্রের নির্দেশমূলক নীতির ক্ষেত্রেও পরিবেশের উল্লেখ করা হয়েছে| তাই এটা নিরাপদে বলা যায় যে, স্বচ্ছ ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশের অধিকার, যেভাবে সুপ্রিম কোর্টেও বলা হয়েছে, তা সভ্য সমাজের এক মৌলিক মতবাদ | ভারতীয় গণতন্ত্রের তিনটি স্তম্ভ—আইনসভা, প্রশাসন ও বিচারসভা— পরিবেশের দীর্ঘস্থায়িত্বের বৈচিত্র্যময় লক্ষ্য পূরণকে কার্যকর করতে স্বেচ্ছাকৃত গণতন্ত্রের ধারনাকে পরিবেশ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে যুক্ত করতে আগ্রহী | পৃথিবীতে থাকা সমস্ত জীবন্ত সত্ত্বার সম্মিলিত রূপ হচ্ছে প্রকৃতি যা পারস্পরিকভাবে একে অপরের ওপর নির্ভরশীল| কিন্তু মানুষের সৃষ্ট দূষণের জন্য প্রচুর প্রজাতি লুপ্ত হয়ে যাচ্ছে এবং বিশ্বের জলবায়ু অত্যন্ত দ্রুত গতিতে পরিবর্তিত হচ্ছে | দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তন আমাদের বর্তমানের ওপর বিরূপভাবে প্রভাব ফেলছে এবং আমাদের ভবিষ্যতের ওপরও বিপজ্জনকভাবে প্রভাব ফেলতে যাচ্ছে| এটা দেখা গেছে যে, যদি বর্তমানের ব্যবহার ও উত্পাদনের পদ্ধতি একই রকম রয়ে যায় এবং জনসংখ্যা যদি ২০৫০ সালে ৯৬০ কোটি পর্যন্ত পৌঁছায়, তাহলে আমাদেরকে জীবনযাত্রা ও ব্যবহারকে বজায় রাখতে গেলে তিনটি গ্রহের প্রয়োজন পড়বে | আজ জলবায়ু পরিবর্তন বিশ্বের এক প্রধান প্রতিকুলতা হিসেবে চিহ্নিত | ভারতে আমরা বিশ্বাস করি যে, জলবায়ু পরিবর্তন হচ্ছে গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমনের ফল এবং এর পরিণতিতে হওয়া বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধি উন্নত দেশগুলির শিল্পের অগ্রগতি ও জীবাশ্ম জ্বালানী থেকে আসছে|

যদিও ভারতের মত এক উন্নয়নশীল দেশে এই বিষয়ে করার খুব সামান্যই রয়েছে| জলবায়ু পরিবর্তনে আবহাওয়ার ছাঁচে পরিবর্তন আসায় এবং প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সংখ্যা বাড়তে থাকায় তা আমাদের লক্ষ লক্ষ কৃষকদের কাছে এক বিরাট হুমকি স্বরূপ | আমাদের গ্রহের দুই প্রান্তের বরফ গলার ফলে সমদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি নিয়ে আমরা চিন্তিত| উত্তর মেরু ও দক্ষিণ মেরু এবছর সবচেয়ে কম বরফের আস্তরণ হওয়ার রেকর্ড করেছে এবং এই বরফ গলে যাওয়াটা আমাদের উপকূল ভাগের কাছে হুমকি স্বরূপ হয়ে উঠেছে| হিমালয়ের হিমবাহ কমে যাওয়া নিয়ে আমরাও চিন্তিত| এই হিমবাহই আমাদের নদীগুলিকে পুষ্ট করে এবং আমাদের সভ্যতাকে লালন করে | জলবায়ু পরিবর্তনের প্রতিকুলতা ভয়ঙ্কর হওয়া সত্বেও তা আমাদেরকে দীর্ঘস্থায়ী উন্নয়ন সুনিশ্চিত করা ও এই গ্রহের সবাইকে উন্নত ভবিষ্যত প্রদানের জন্য এনিয়ে ভাবার সুযোগ প্রদান করছে | প্যারিস চুক্তি অনুসারে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার তাদের কার্বন নির্গমন দ্রুত কমানোর জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছে, যাতে বিশ্বের উত্তপ্ত হওয়াকে ২ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড-এর নিচে রাখা যায় | স্বাক্ষর করা দেশগুলোর বেশিরভাগ ইতোমধ্যেই এই লক্ষ্য পূরণের জন্য জাতীয় অ্যাকশন প্ল্যান উপস্থাপিত করেছে| আমি আশা করছি এই প্ল্যান সময়ের সঙ্গে আরও মজবুত হবে | জাতীয় এই সিদ্ধান্তের মধ্যে রয়েছে পুনর্নবীকরণ শক্তির লক্ষ্য, দীর্ঘস্থায়ী পরিবহন ও শক্তি দক্ষতা |

এছাড়াও আমি অবশ্যই বলব যে, প্রাকৃতিক মূলধনের জন্য সমস্ত দেশগুলির নীতি গ্রহণের বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত | প্যারিস চুক্তি নিজেই একটি গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা চিহ্নিত করেছে যে, বায়ুমন্ডলে কার্বন নির্গমন নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র ভূমিকা নেয় | আমাদেরকে তাই বর্তমানের বাস্তুতন্ত্রকে সুরক্ষিত রাখতে উপায়-উপকরণ গ্রহণ করতে হবে এবং মানব-বান্ধব পদ্ধতিতে ক্ষয়ে যাওয়া বাস্তুতন্ত্রকে প্রসারিত করতে হবে | এটা বিশেষভাবে জলাভূমির ক্ষেত্রে সত্য| যার মধ্যে রয়েছে জলাশয়, বন্যাক্রান্ত এলাকা, তৃণভূমি, ম্যানগ্রোভ ও প্রবল দ্বীপ—যা পুরোপুরিভাবে অথবা মরসুমের সময় জল দ্বারা বেষ্টিত থাকে | আমরা চাই পৃথিবী যাতে এক্ষেত্রে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়| বিশ্বের উষ্ণতা ও জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহতা রুখতে প্রতিটি দেশের জন্যই একটি ব্যাপক, ন্যায়সঙ্গত ও দীর্ঘস্থায়ী কার্যকর পরিকল্পনা প্রয়োজন | বিশ্বব্যাপী এই হুমকির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ভারত এক গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করছে| ভারত সরকার সম্প্রতি ২০২২ সালের মধ্যে পুনর্নবীকরণ বিদ্যুত উত্পাদন ১৭৫ গিগাবাইট করার এক লক্ষ্য গ্রহণ করেছে| ২০৩০ সালের মধ্যে আমাদের উত্পাদনের ৪০% আসবে জীবাশ্মহীন জ্বালানী থেকে | আমরা বর্জ্য পদার্থকে শক্তিতে রুপান্তরিত করার জন্যও প্রযুক্তির সন্ধান করছে| ভারত তাপ বিদ্যুতের জন্য সুপার-ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করছে | ভারত সরকার যানবাহনের জন্য জ্বালানীর গুণমানকে উন্নত করছে| ভারত বিশ্বের কয়েকটি দেশের মধ্যে একটি যেখানে কয়লার ওপর কর আরোপ হচ্ছে|

পেট্রো-পণ্যের ওপর থেকে আমরা ভর্তুকি কমিয়ে দিচ্ছি| আমরা পুনর্নবীকরণ বিদ্যুতের ওপর করমুক্ত বন্ড চালু করেছি | আমাদের বনের পরিধি বিস্তৃত করার জন্য এবং আমাদের জৈব-বৈচিত্র্যকে রক্ষা করার জন্যও আমাদের পরিকল্পনা রয়েছে | উন্নয়ন ও পরিবেশকে একে অপরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা চাই, দুই ক্ষেত্রের মধ্যে পরস্পরের বিরোধ দিয়ে দেখা ঠিক নয়| সবচেয়ে বড় কথা, যদি পৃথিবীই না থাকে তাহলে উন্নয়ন কোথায় হবে? পরিবেশের সুরক্ষায় গুরুত্ব না দিয়ে সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব নয় | আজ যখন বিশ্ব উষ্ণায়নের ক্ষতিকর প্রভাব এবং সম্পদের রিক্ততার মুখোমুখি, তখন পরিবেশ সুরক্ষা বিশ্বের এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে | এই পরিবেশ সম্মেলনের পেছনে ধারণা হচ্ছে মূলত পরিবেশ নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য| নতুন নতুন প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করে, নতুন সম্ভাবনার পথ খুলে দিয়ে এবং নতুন এক বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে পুরনো সমস্যাগুলোকে কার্যকরভাবে দেখার জন্য | এর জন্য মনের উদ্ভাবনামূলক ব্যবহার প্রয়োজন| সম্মেলনের গতানুগতিক আলোচনা থেকে সরে গিয়ে সৃষ্টিশীল কল্পনাপূর্ণ ভাবনা প্রয়োজন | আমি এটা দেখে আনন্দিত যে, বিস্তৃত আলোচনা ফলপ্রসূ হয়েছে | আমি বিশ্বাস করি যে, এখানে যেসব সিদ্ধান্ত ও প্রস্তাব গৃহিত হয়েছে তা পরিবেশগত ব্যবহার ও চিন্তা-চেতনায় বাস্তব অগ্রগতি সূচিত করবে |”