নারকোটিক্স এবং "সবথেকে পুণ্যবান" মানসিকতাঃ সমসাময়িক যুগের দ্বিচারিতার ট্র্যাজেডি

ডেভিড দেববর্মা , সামাজিক কর্মী

 

আমরা স্বার্থপর সামাজিক সভ্যতায় বসবাস করি স্বার্থপর? আপনি প্রশ্ন তুলতেই পারেন হ্যাঁ, এটাই ঠিক অবশ্যই, আমরা একত্রে বসবাস করি, এলাকায় ঘড়বাড়ি তৈরি করে থাকে, একই ছাদের নীচে থেকে কাজ করি, একই স্কুলে পড়াশুনা করি, কিন্তু, আমরা একে অপরের থেকে অনেকটাই দূরে সরে এসেছি, মানবতা থেকে স্খলিত হয়ে যাচ্ছি যা আমাদের বন্যজগতের প্রাণীদের থেকেও ভিন্ন হয়ে চলেছি আমরা লোকজনকে প্রতিদিন জীর্ণতা আর দীর্ণতায় থাকতে দেখছি, রাস্তার পাশে, মাদক দ্রব্যের দোকানের পাশে, অন্ধকার চোরাগলিতে কিন্তু, আমরা কি বিন্দুমাত্র পরোয়া করি? আমরা কি এক মুহূর্তের জন্য দাঁড়াই আমাদের পাশের লোকটিকে সাহায্য করার জন্য?

এটা নিশ্চিত যে, যখনই জাতীয় স্তরের কোনো বিপর্যয় এর বিষয় আসে আর সেটা দেশে আলোচনার মুখ্য বিষয় হয়ে উঠে তখন আমরা সবাই আসক্তি দেখাই এবং আমাদের যা করণীয় তা করি, আর বিষয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই কিন্তু, ঠিক একই সময়ে, যখন কোনো একজনকে দুর্দশায় পড়ে থাকতে দেখি, আমাদের এক মুহূর্তও দেরি হয়না পীড়িত লোকটিকে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে, সেই পুরুষ কিংবা মহিলার কথা দ্বিতীয়বারের জন্য আর মাথায় না এনে আমি নিশ্চিত যে, যিনি এক্ষুনি এই প্রতিবেদনটি পড়ছেন আলাদা, আপনি হয়ত যত্নবান, এবং অনেক সাহায্য করেছেন জীবনে কিন্তু তবুও প্রশ্ন থেকেই যায়, তবুও কেন আমাদের সমাজ এখনো জর্জরিত কেন এটা দিন দিন ভেঙে পড়ছে কেন এমন হয় যে সমাজের আর্থ-সামাজিক ভাবে নীচুস্তরের লোকেদের ব্রাত্য ভাবা হয় যখন তারা সেই একই অভিশাপের শিকার হয় যা সমাজের উঁচু স্তরের ক্ষেত্রে হলে বলা হয় 'ধাক্কা' একটু দাঁড়ান, আমি কি নিয়ে কথা বলতে চাইছি? নেশাদ্রব্য

হ্যাঁ, আমি নেশায় আসক্ত এবং গ্রহনকারীদের বিষয়ে কথা বলছি না, এখানে আশ্চর্য হবার অভিনয় করবেন না সেটা করে আর কোনো উপকার হবেনা আমরা এটা অস্বীকার করতে পারব না যে যখন নেশার শিকার হয়, পুরো দুনিয়া এক হয়ে হাতে হাত মেলায় এবং প্রার্থনা করে সেই 'হতদরিদ্র' আত্মার জন্য এবং বিশ্বমানের রিহ্যাবিলেটশন সেন্টারে দ্রুত আরোগ্য কামনা করে সোশ্যাল মিডিয়াতে শুভেচ্ছা পাঠায়, সম্ভবত কিছু ফুল এবং উপহারও প্রেরণ করে, তাদের পরিবারের লোককে সান্ত্বনা দেয় যে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে, এবং আরোগ্যলাভের পর যখন তারা ফিরে আসে তখন উচ্ছসিত হয় আনন্দে মেতে উঠে কোনো ছায়াছবি কিংবা গানের এ্যালবামের বড় আকারের মুক্তি দিয়ে যেমন ধরে নিন আমাদের দেশি 'সনজু', অথবা আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ডেমি লোভাটো, চার্লি শিন, কিংবা কার্ট কোবেন, আমাদের কয়েক সেকেন্ড প্রয়োজন তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে ফেসবুক বা টুইটারে কাল্পনিক হ্যাশটাগ দিয়ে, আর ঠিক একই সময়ে আমাদের পাশের বাড়ির 'রাজু' ছবি ফেসবুকে শেয়ার করি যে গাঁজা নিয়ে যাবার সময় পুলিশের হাতে ধরা পড়ে, স্থানীয় পুলিশ স্টেশনে হাতকড়া হাতে, তার অস্তিত্বের উপর লজ্জিত হই এবং ওর নাম ধরে ওর পরিবারের লোকেদের হুমকি দিতে থাকি ওহ, আমি কি এই সভ্যতাকে স্বার্থপর সামাজিক সভ্যতা বলেছিলাম? হায় ভগবান, আমি সুশোভিত বিশেষণ 'দ্বিচারি' যুক্ত করতে ভুলেই গেছি, কারণ আমরা সেটাই, হৃদয়ের গভীর থেকেই দ্বিচারি 

আমি মনে করি আমিও একজন ভিন্ন প্রকৃতির দ্বিচারি হব যদি আমি  ঘুড়েফিরে শুধুমাত্র সমস্যার কথাই বলতে থাকি কোনো প্রকারের সমাধান না বলে আমাদের এটা বোঝা প্রয়োজন যে সমস্যাটা শুধুমাত্র নেশাজাত দ্রব্যাদি নয়, নেশার প্রতি আসক্তি এবং তার দীর্ঘস্থায়ী কু-প্রভাব সাধারণ মানুষজন যাদের নেশাসামগ্রী সেবন করতে বাধ্য কিংবা বোকা বানানো হয় তারা আসল অপরাধী নয় আসল অপরাধী এই শৃঙ্খলের একেবারে উপরে থাকে, প্রায়শই নীরব, মাত্রাতিরিক্ত লাভের আশায় সমাজে নারকোটিক সামগ্রী ছড়ায় এমন একেবারেই নয় যে যারা এই নেশাজাত সামগ্রী ক্রয় করে তারা মোটেই অপরাধী নয়, না কিন্তু যদি সত্যিকারে আমরা এই অভিশাপের সাথে লড়াই করতে চাই,তবে আমাদের এই সমস্যাটাকে খুব গভীরে গিয়ে নীচ থেকে বোঝার চেষ্টা করতে হবে প্রথম প্রশ্ন হল, কারা এই ড্রাগ মাফিয়া? এই 'মাফিয়া'রাই নেশাচক্রের আসল নাটের গুরু যারা এর উৎপাদন এবং বন্টনকে নিয়ন্ত্রন করে এটা ওদের জন্য শুধুই একটা ব্যাবসা, এবং এই বিষয়ে ওরা খুবই ঠান্ডা মস্তিস্কের হয় ওরাই আসল অভিযুক্ত যাদের গ্রেপ্তার করা উচিৎ এবং জেলে ভরা দরকার এখন, দ্বিতীয় প্রশ্নে আসা যাক, "কারা এই নেশাখোর?"

এই নেশায় আসক্ত লোকেরা আর কেউ নয় সাধারণ জনগণ যারা নেশার জালে জড়িয়ে পড়ে এবং ক্রমশ গভীরে চলে যায় এটা সত্যিই চরম আশ্চর্যের বিষয় যে যারাই তাদের প্রথম নেশা সামগ্রী প্রথমবারের কেনে, তারা সবসময় অন্য কারোর দ্বারা এই নেশার দুনিয়ার সাথে পরিচিত হয়, খুব সম্ভবত কোনো বন্ধু, সহকর্মী কিংবা কোনো পরিবারের সদস্য যতক্ষন না পর্যন্ত প্রচন্ড কড়া নেশা সামগ্রী  যেমন হেরোইন কিংবা ডাইনোরফিন দ্বারা নেশাসক্ত হচ্ছে, এটা অসম্ভব যে সে প্রথম সেবনের দিন থেকেই আসক্ত হয়ে পড়বে তৃতীয় প্রশ্নটি হল, "কি এমন বিষয় আছে যা এদেরকে প্রথম দিন থেকেই তথাকথি 'কড়া' নেশাদ্রব্যের প্রতি টেনে আনে?" উত্তরটা একেবারেই সহজ সময়, বেকারত্ব এবং সচেতনতার অভাব এটা আশ্চর্যের বিষয় নয় যে, আমরা বেশিরভাগ নেশা আসক্ত যাদের সচরাচর দেখি তারা সবাই হয় কলেজ পড়ুয়া ছাত্র নতুবা বেকার যুবক

আগরতলার মত জায়গাতে, যেখানে সবথেকে বেশি সহজপ্রাপ্য ড্রাগ হল মারিজুয়ানা এবং ব্রাউন সুগার এবং সেখানে সবথকে বেশি জনসংখ্যা যারা আস্কত হয় তারা যুবক রাজ্য পুলিশ এবং অন্যান্য দপ্তর এই চক্রকে বেফাঁস করা এবং মজুত করে রাখা নেশা সামগ্রী আটক করে রাখার জন্য তাদের সর্বোত্তম প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে অতিসম্প্রতি তারা ৫০০ কেজির বেশি গাঁজা সোনামুড়া থেকে উদ্ধার করতে পেরেছে এখানে মূল যে সমস্যা তা হল ড্রাগ মাফিয়াদের জন্য এটা খুব সামান্য পরিমাণ, খুব সহজেই তারা এই লোকসান পুরণ করে নিতে পারবে এবং অতি শীঘ্রই নতুন করে তা পাচার করতে পারবে আর অন্যদিকে, পুলিশ ছোটোখাটো দালাল পাচারকারীদের আটক করে যাচ্ছে ভাল, ওদের গ্রেপ্তার হওয়া প্রয়োজন, কিন্তু শুধুই ওদের শাস্তি দেওয়া নয়, কারণ আগামীতে তা কোনোভাবেই ফলপ্রসু হবেনা যেটা সবথকে বেশি জরুরি তা হল এই নেশাসক্তদেরকে রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারে প্রেরণ করা

সবথকে বাস্তব সত্য রাজ্যের রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারগুলো নিয়ে এই যে ওরা হয়ত সেবনকারীর শরীর থেকে ড্রাগ সরিয়ে দিতে কার্যকর হবে কিন্তু তারা সেবনকারীর মানসিকতা এবং জীবনযাপনে পরিবর্তন আনতে অক্ষম আর সেখানেই আসছে আমার কার্যকরী সমাধানের প্রস্তাব এই রাজ্যের প্রয়োজন আরো অধিক পরিমাণে কার্যকরী রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার যেখানে শুধুমাত্র সেবনকারীর শরীর থেকে ড্রাগ বের করে আনবে, বরং উপযুক্তমাপের সাইকোলজিকাল কাউন্সিলিং করবে এবং দীর্ঘস্থায়ী ফলাফলের জন্য, ওদের বাস্তব দুনিয়ায় কার্যকরী হবার উপায় করে দিতে হবে আর তার জন্য, আমি মনে করি যে এই রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারগুলোর সাথে  PMKVY  কেন্দ্রগুলিকে যুক্ত করতে হবে স্কিল ডেভেলোপমেন্ট করার জন্য যেখানে আক্রান্ত ব্যক্তিরা ট্রেনিং এর মধ্যে দিয়ে যাবে সংশোধনের পাশাপাশি এইভাবে, যখন তারা ছাড়া পাবে, তারা চাকরির জন্যও উপযুক্ত হতে পারবে এবং কোনো কাজে যুক্ত হয়ে যেতে পারবে যখন তারা একটি দায়িত্বপূর্ণ জীবনযাপনের মূল্যবোধ অনুধাবন করতে পারবে, সাধারণ মনস্তাত্বিক ক্ষমতা প্রয়োগের মধ্য দিয়ে, ওরা অনেকবেশি সাধারণ জীবনযাপন সম্মানের সাথে বাঁচার প্রতি মনোযোগী হতে পারবে, নাকি নারকোটিক্সের উপর সময় নষ্ট করে ওদের পরিবারের কাছে অন্যথায় সমাজের কাছে বোঝাস্বরূপ হবে 

টা তখনই সম্ভব হবে যদি সরকার যারা পথ হারিয়ে ফেলেছে তাদের শুধু বেআইনি কার্যকলাপের জন্য শাস্তি প্রদান না করে তাদের ফেরানোর উদ্যোগ নেয় এবং সমাজ এইসব আক্রান্তদের সাহায্য করবে পুনর্বাসন এবং সংশোধন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে একটি প্রবাদ আছে,"অপরাধকে ঘৃণা কর, অপরাধীকে নয়" যা এখানে যথাযোগ্য আর তাই আমি সবাইকে অনুরোধ করব আপনারা আপনাদের দ্বিচারিতা অন্যের গায়ে মিশিয়ে দেবেন না বরঞ্চ যার আপনার সাহায্যের প্রয়োজন তাকে সাহায্য করুন সমবেদনাই হল আসল চাবিকাঠি, সমাজের দায়দায়িত্ব থেকে নিজেকে দূরে রেখে স্বার্থপর হলে আমাদের দেশের হৃদয় ক্রমশ অন্ধকারাচ্ছন্ন হতে থাকবে শুধুমাত্র একটি অবহেলা এবং দোষারাপের পাশাপাশি এটাই আমার কথা, আমি ভাবছি আপনার বিবেকও কি আমার সাথে সাথে স্পন্দিত হচ্ছে? নাকি আপনি নিমেষেই চোখ সরিয়ে নেবেন যা এখন অব্দি আপনি পড়েছেন এবং 'রাজু' দুনিয়াকে ছোটো করতে থাকবেন আর 'সনজু' মত লোকের পায়ের ধূলি নেবেন? জাতির জানা প্রয়োজন