হাট বসেছে ভারত-বাংলা সীমান্ত পারে

তরুন চক্রবর্তী

আগরতলা, ১৯ জানুয়ারিঃ-  পাসপোর্ট বা ভিসার বালাই নেই। নেই ভ্রমণকরের বাড়তি বোঝা। বৈধ নাগরিকত্বের কাগজপত্র থাকলেই বিদেশে কিছুটা সময় কাটানোর হাতছানি। সঙ্গে কেনাকাটির অঢেল সুযোগ। সঙ্গে বাড়তি পাওনা বিদেশী আত্মীয়দের সঙ্গে মেলামেশার অঢেল সুযোগ। আবেগের টানে দূর, দূরান্ত থেকে উভয়পারের মানুষ ভীড় জমাচ্ছেন আন্তর্জাতিক হাটে। দেশবাগে জ্বালা বুকে বয়ে দুই পারের বসবাসকারী আত্মীয়রা। মিলন মেলা হয়ে উঠেছে সাপ্তাহিক হাট। উভয় দেশের পণ্যের পাশাপাশি মেলামেশার সুযোগই হয়ে উঠেছে মেলার বড় পণ্য।সীমান্তের দুই পারের মানুষদের আর্থিক উন্নয়নের কথা মাথায় রেখেই দক্ষিণ ত্রিপুরার শ্রীনগর আর সিপাহিজলার কসবায় গড়ে উঠেছে সীমান্ত হাট। সাপ্তাহিক এই হাটে সীমান্তের দুই পারের হাজার হাজার মানুষ ছুটে আসছেন। ত্রিপুরার বেশির ভাগ মানুষেরই শিকড় বাংলাদেশে। তাই সে দেশের মাটি স্পর্শ করার আবেগই আলাদা।  ভারতীয় নাগরিকদের সাফ কথা, বাংলাদেশে ঢোকার সুযোগ পাচ্ছি। খুব খুশি। একই বক্তব্য বাংলাদেশীদেরও। তাঁরাও ভীড় জমাচ্ছেন সীমান্ত হাটে। কেনাকেটা করছেন। বিজিবি-র কাছে মাত্র ২০ টাকা দিয়ে রসিদ কেটেই ঢুকতে পারছেন ইন্ডিয়ায়। আগে থেকে ফোনে বা হোয়াটসআপে কথা বলা থাকছে আত্মীয়দের সঙ্গে। হাটে এসে অবাধে মেলামেশা করতেও পারছেন। দিনভর প্রাণখুলে গপ্পো-গুজব করার পর সন্ধ্যায় আবার ফিরে্ যাচ্ছেন নিজেদের বাড়িতে। অনেক দূর থেকে লোকজন আসছেন, বিদেশ বিভূঁই ভ্রমণের এই সহজ সুবিধাটুকু নিতে।

মেলামেশার পাশাপাশি বেচাকেনাও চলছে জোরকদমে। প্রথম দিকে কিছুটা কড়াকড়ি ছিল। এখন স্থানীয়দের আবেগের কাছে কিছুটা নরম প্রশাসনও। ইন্ডিয়ান ফুড প্রোডাক্টস থেকে শুরু করে অন্যান্য সামগ্রী যেমন বিক্রি হচ্ছে, তেমনি পাওয়া যাচ্ছে বাংলাদেশের প্লাস্টিকের সরঞ্জাম। রয়েছে তেলাপিয়া, মরুলা থেকে ইলিশের সম্ভারও। এমনকী, পাওয়া যাচ্ছে জ্যান্ত হাইব্রিড মাগুর বা নোনা থেকে শুরু করে অন্যান্য শুঁটকিও। দামও নাগালের মধ্যে। ফলে রথ দেখা ও কলাবেচা দুই-ই চলছে এই হাটে। দাবি উঠছে, একদিনের বদলে দু-দি্নের হাট করার। সাব্রুমের বিধায়ক তথা হাট কমিটির সদস্যা রীতা কর জানালেন, তাঁরা বিষয়টি বিবেচনা করে দেখছেন। প্রস্তাব গিয়েছে বাংলাদেশের কাছেও। সেখানেও উকসাহের ঘাটতি নেই।

প্রাথমিক ভাবে বেশ কিছুদিন কেটে যাওয়ার পর, ইতিবাচক অভিজ্ঞতার নিরীখে ত্রিপুরার সীমান্তহাটের দ্বিগুন উন্নতি চাইছে ভারত ও বাংলাদেশ উভয়ই। দাবি উঠছে বর্তমানের দু-টির বদলে্ জেলায় জেলায় গড়ে উঠুক সীমান্তহাট। সেইসঙ্গে বর্তমানে বর্ডার হাট থেকে সর্বোচ্চ ক্রয়ের সীমা ১০০ ডলারের বদলে ২০০ ডলার এবং দোকানদারের সংখ্যা উভয় দেশ থেকেই ২৫ থেকে বাড়িয়ে ৫০ করারও প্রস্তাব আসছে। ২০১৫ সালে ১৩ জানুয়ারি ভারতের ত্রিপুরার রাজ্যের দক্ষিণ ত্রিপুরা জেলার শ্রীনগর এবং বাংলাদেশের চট্টগ্রাম জেলার ছাগলনাইয়ার মাঝে চালু হয় সীমান্তহাট। পরবর্তীতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বাংলাদেশ সফরের সময়, ২০১৫-রই ৬ জুন চালু হয় ত্রিপুরারই সিপাহিজলা জেলার কমলাসাগর এবং বাংলাদেশের ব্রাক্ষ্ণণবেড়িয়া জেলার তারাপুর সীমান্তহাটের। ত্রিপুরা সরকারের শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রকের অতিরিক্ত পরিচালক স্বপ্না দেবনাথ জানিয়েছেন, বাংলাদেশের মৌলভিবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার কুরমাঘাট এবং ত্রিপুরারই ধলাই জেলার কমলপুর মহকুমার মরাছড়ায় সীমান্তহাট নির্মাণের বিষয়ে বাংলাদেশের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। 

তিনি আরও জানান একই রকম ভাবে উত্তর ত্রিপুরা জেলার রাগনার পালবস্তি এবং বাংলাদেশের মৌলভিবাজার জেলারই জুরি উপজেলার পশ্চিমবাটুলিতেও সীমান্তহাট নির্মাণের প্রস্তাবও বিবেচনাধীন রয়েছে। এই দুই হাট নির্মাণে চূড়ান্ত প্রকল্প প্রতিবেদন বা ডিপিআর-ও প্রস্তুত বলে জানিয়ে স্বপ্না দেবনাথ বলে্ন, এই দুটি প্রস্তাবিত হাটের জন্য ২কোটি ৮৮ লাখ এবং ২ কোটি ৯২ লাখ টাকার প্রকল্প ভারত সরকারের অনুমো দনের জন্য তাঁদের দপ্তর থেকে পাঠানো হয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, শুধু হাটের সংখ্যা বৃদ্ধিই নয়, হাটে ক্রেতারা যাতে ২০০ ডলার পর্যন্ত কেনাকাটা করতে পারেন এমন প্রস্তাবও উঠে আসছে হাট কমিটির বৈঠকে। সেইসঙ্গে দাবি উঠছে দোকানদারের সংখ্যা বাড়ানোরও। এই প্রসঙ্গে ত্রিপুরার প্রাক্তন শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রী তথা রাজ্য বিধানসভার বর্তমান উপাধ্যক্ষ পবিত্র কর জানান,  বর্ডার হাটের বিপুল সাফল্য থেকেই বোঝা যাচ্ছে উভয় দেশের মানুষের স্বার্থেই অবিলম্বে যাবতীয় বিধিনিষেধ শিথিল করে উভয় পারে মানুষদের জন্য খুলে দেওয়া উচিত হাটের দরোজা। সেই সঙ্গে তিনি সীমান্তে প্রহরারত বিএসএফ জওয়ানদেরও আরও মানবিক হওয়ার পরামর্শ দেন। তাঁর দাবি, প্রতিটি জেলাতেই সীমান্তহাট গড়ে তুলতে হবে।

আগরতলায় বাংলাদেশ মিশনের সহকারী হাইকমিশনার মহম্মদ শে্খাওয়াতে হোসেনও বলেন, আরও বেশি করে সীমান্তহাট হলে উভয় দেশেরই ভালো হবে। মানুষের মেলামেশাও বাড়বে। সেইসঙ্গে হাটে বিভিন্ন সামগ্রীর ওপর জারি করা নিষেধাজ্ঞাও শিথিল করার পক্ষে সওয়াল করেন তিনি। এ প্রসঙ্গে ত্রিপুরার শিল্প ও বানিজ্য মন্ত্রী তপন চক্রবর্তীকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, রাজ্য সরকার মনে করে সীমান্তহাট দারুন সফল। তাই পরিকাঠামোর আরও উন্নতি করে সময়ে প্রয়োজনেই আরও বেশি করে উভয়পারের মানুষকে তাঁদের উতপাদিত সামগ্রী বিকিকিনির সুযোগ দিতে হবে। 

প্রস্তাবিত নতুন সীমান্তহাট দুটিও দ্রুত চালু করার পাশাপাশি সবদিক পর্যালোচনা করে হাট একদিনের বদলে দু-দিনের করা যায় কিনা সেটাও বিবেচনা করার দাবি তুলেছেন তিনি। তপন চক্রবর্তীর মতে, সীমান্তহাটের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে উভয়পারের মানুষের আবেগ। মেলামেশার এই মঞ্চ প্রকৃত অর্থেই হয়ে উঠেছে মিলনমেলা। তাই সেই আবেগকে সম্মান জানাতেই এগিয়ে আসতে হবে দুই দেশকে। আর তারফলে আরও উন্নত হবে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক।

সম্পর্কের উন্নতি হোক বা না হোক, ব্যবসায়ীক শ্রীবৃদ্ধি কিন্তু চোখে পড়ার মতো। এমনিতে উত্তর পূর্ব ভারত থেকে রপ্তানি তেমন একটা হয় না। বরং বাংলাদেশ থেকে আমদানিই বেশি হয় আমাদের। কিন্তু সীমান্ত হাটের ছবিটা উল্টো। ট্রেড ব্যালান্স আমাদের পক্ষে। চলতি বছরের ১ এপ্রিল থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী কমলাসাগর-তারাপুর সীমান্তহাটে ভারতীয় পন্য বিক্রি হয়েচে ২কোটি ৭৮ লক্ষ ৩০ হাজার ৮৮ টাকার। বিনিময়ে বাংলাদেশী পণ্য আমরা কিনেছি মাত্র ৪ লক্ষ ৩৯ হাজার ৭৯০ টাকার। প্রসঙ্গত, প্রথাগত ভাবে ত্রিপুরার বাতসরিক রপ্তানির পরিমান কিন্তু ১ কোটি টাকারও কম। শ্রীনগর-ছাগলনাইয়া সীমান্ত হাটে ব্যবসার পরিমাণ আরও বেশি। ভারতীয় পণ্য বিক্রি হয়েছে এই ৫ মাসে ৩ কোটি ২৬ লক্ষ ৫৮ হাজার ৩০০ টাকার। অন্যদিকে, বাংলাদেশী পণ্যের বিক্রির পরিমাণ ১ কোটি ৭৯ লক্ষ ৯৮ হাজার ২০০ টাকা। অর্থীনিতিবিদরাও এই সীমান্ত বাণিজ্যকে স্বাগত জানাচ্ছেন। তাঁদের মতে, স্থানীয় অর্থনীতিতে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। সেইসঙ্গে দ্রব্যমূল্যের বাজার দরও থাকবে নিয়ন্ত্রণে।প্রথম দিকে, অনেকেই আশঙ্কা করেছিলেন, হাটের নাম করে অনুপ্রবেশের দরোজা খুলে যাবে। কিন্তু সীমান্তরক্ষীরা উভয় দেশেই বিষয়টি নিয়ে যথেষ্ট সজাগ। তাছাড়া সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়াও এক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে। বরং উভয় দেশের পর্যটকদের কাছে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছে এই সীমান্ত হাট। বিনি পয়সায় বিদেশ ভ্রমণের সহজতম উপকরণ।